শুক্রবার   ২৩ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১০ ১৪৩২   ০৪ শা'বান ১৪৪৭

যাদের ভোটে বদলে যেতে পারে সমীকরণ

মাসুদ করিম, ঢাকা থেকে

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৫:৩৩ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ শুক্রবার



গণ আন্দোলনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধরনে অনেক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তরুণ ভোটার যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছর তাদের সংখ্যা চার কোটি। তাদের ভোটে বদলে যেতে পারে সমীকরণ। এছাড়াও, গার্মেন্টস শ্রমিক, বস্তিবাসী, রিকশাচালক, দিনমজুর, নারী ভোটারের মতো নীরব ভোটাররা ভোট বিপ্লব ঘটাতে পারে। প্রবাসীদের ভোট না এলে ফলাফল ঘোষণা করা হবে না। নির্বাচন কমিশন এমন ঘোষণা দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোট কিছুটা হলেও ভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও প্রবাসীদের মধ্যে ভোট সরাসরি দুই ভাগ হয়ে আছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ এগিয়ে আসার সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়ছে। শুরু হয়ে গেছে ভোটের প্রচারযুদ্ধ। প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘণ করছে। প্রার্থীদের প্রভাব ও বেপরোয়া আচরণের কারণে নির্বাচন কমিশনের অসহায় অবস্থা। আচরণবিধি লংঘণ করে প্রার্থীরা কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটকে হুমকি পর্যন্ত দিচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপি থেকে বহিস্কৃত রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সরকারিভাবে প্রচার শুরুর আগেই ভোটের প্রচারে নেমে পড়েছেন। আচরণবিধি লংঘণ করায় কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট বাঁধা দিলে রুমিন ফারহানা তাকে হুমকি দেন। এই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রচারে নানা রকমের কৌশল গ্রহণ করেছে দলগুলো। বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন পৃথক জোট দুদল্যমান ভোটার, নারী ও তরুণ ভোটারদেরকে নিজ নিজ দল ও জোটের পক্ষে নেবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথাগত হজরত শাহজালাল (রহঃ) এবং শাহ পরান (রহঃ) এর মাজার জিয়ারত করার মাধ্যমে ভোটের প্রচার শুরুর পথ বেছে নিয়েছেন। তারপর তিনি চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাতেও নির্বাচনী জনসভা করবেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা শফিকুর রহমান প্রচার শুরু করতে বেছে নিলেন উত্তরাঞ্চল সফর। প্রচারের শেষ দিন পর্যন্ত দুই নেতা পর্যায়ক্রমে সারাদেশে অনেকগুলো নির্বাচনী জনসভা করবেন বলে আভাস পাওয়া যা”েছ। জনসভা ও পথসভাগুলোতে ব্যাপক শোডাউন করা হবে। দুই জোটেই ভোটারদের কাছে টানতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটার, আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটার এবং সংখ্যালঘূ ভোটারদের উভয় দল ও জোট টার্গেট করে প্রচার করছে।  
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি নারী ভোটার। বিএনপি এই ভোটারদের ভোট পাবার লক্ষ্যে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান এক আলোচনায় নারীদের সামনে এগিয়ে নেবার লক্ষ্যে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যদিও দলগুলো নারী প্রার্থী মনোনয়ন অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে মাত্র চার দশমিক ছয় শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে দলগুলো। বিগত নির্বাচনগুলোতে প্রায় ২০ শতাংশ নারী প্রার্থী দিয়েছিলো বিভিন্ন দল। এবার জামায়াতে ইসলামী কোনও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। জাইমা রহমান স্পষ্ট করেছেন, রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এসব ব্যাপারে বিএনপি উদার অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে হিজাব কিংবা বুরখা পরিধানের ব্যাপারে বিএনপি নারীর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেবে। কেউ ইচ্ছা করলে হিজাব কিংবা বুরখা পরতে পারেন। জামায়াতে ইসলামী এই বিষয়ে তাদের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু না বললেও তারা নারী সংগঠনের মাধ্যমে নারীদের ভোট তাদের পক্ষে নেবার চেষ্টা করছে।
জামায়াতে ইসলামী টার্গেট করেছে মূলত নতুন ভোটার। এবার প্রায় চার কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন যারা প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাবেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির বিপুল বিজয় লাভ করে। তখন থেকে জামায়াত খুব চাঙ্গা। নতুন ভোটাররা তাদের পক্ষে যাবে বলে দলটি মনে করে। যদিও ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাপট এবং ক্যাম্পাসের বাইরের অব¯’া এক নয় বলে বিএনপি নেতারা বলছেন। তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেতে নতুন নতুন ধারনা সামনে আনছে বিএনপি। ইশতেহারে তার বিস্তারিত থাকছে।
অনেকে মনে করেন, এবারের ভোটে বড় ফ্যাক্টর হবে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট। অর্ন্তবর্তি সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে শেখ হাসিনাসহ দলটির সিনিয়র নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ¯’গিত রেখেছে। তার সূত্র ধরে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট পাবার জন্যে মুখিয়ে আছে সবাই। আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে হাত দিতে চায় বিএনপি, জামায়াত উভয়ে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ অবশ্য ভারতে অব¯’ান করে ভোটকেন্দ্রে না যাবার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ায় এটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হচ্ছে না। তবে মাঠ পর্যায়ের খবর, আওয়ামী লীগের কিছু ভোটার ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। কিছু ভোটার বিএনপিকে ভোট দেবেন। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে জামায়াতকেও ভোট দিতে পারে কেউ কেউ।
সংখ্যালঘূ বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট নিয়ে উদ্বেগ আছে। হিন্দুরা সাধারনত নৌকায় ভোট দিয়ে থাকে। তাদেরকে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক মনে করা হয়। বাংলাদেশের মোট ভোটারের প্রায় ১০ শতাংশ সংখ্যালঘূ। এবার আওয়ামী লীগ ভোটের লড়াইয়ে না থাকার কারণে সংখ্যালঘূদের ভোট নিয়ে টানাটানি তৈরী হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত উভয়ে চাইছে এই ভোট। তবে সংখ্যালঘূ বিশেষ করে হিন্দুরা শঙ্কায় আছে ভোটের আগে, ভোটের সময় কিংবা পরে তাদের ওপর হামলা করতে পারে কোনও পক্ষ।
ভোটার উপস্থিতি কেমন হয় এটা একটা বড় ফ্যাক্টর। নির্বাচনে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ভোটার উপ¯ি’তি কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ভয়-ভীতি থাকলে নারী ভোটারের উপ¯ি’তি কম হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপি কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। তবে জামায়াতের জোটে ইসলামী আন্দোলন না থাকায় তাদের জোট হোচট খেয়েছে। জোটের হিসাব, ভোটের হিসাব এবং নানা ফ্যাক্টরের মধ্য দিয়ে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যা”েছ। একই দিনে অনুষ্ঠিত হ”েছ সংস্কার প্রশ্নে গণভোট।