বৃহস্পতিবার   ১৫ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১ ১৪৩২   ২৬ রজব ১৪৪৭

নির্বাচনি ট্রেনে হাতেগোনা নারী

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০১:২৬ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন। শতাংশের হিসাবে যা ৪ দশমিক ২৪ ভাগ। এর মধ্যে ৬৮ জন নারী দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।

 

এই নারী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপি থেকে ১০ জন, এনসিপি থেকে ৩ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৬ জন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে ৩ জন, জেএসডি থেকে ৬ জন, গণসংহতি আন্দোলন থেকে ৫ জন ছাড়াও আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক দল থেকে নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীরা। এ সংখ্যা ৪১ জন।

 

এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি।

 

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নারীদের মধ্যে অনেকের হলফনামা অনুযায়ী তাদের আয় ও সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। কোটিপতি নারীর সংখ্যা ৩০ জনের কাছাকাছি।

 

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর পর যাচাইবাছাই শেষে অনেকের প্রার্থিতা বাতিল হয়। আপিল করার পর অনেকেই আবার তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে আছেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা, কুমিল্লা-৬ বাসদের কামরুন্নাহার সাথী, খুলনা-৫ জাতীয় পার্টির শামীম আরা পারভিন, ভোলা-২ স্বতন্ত্র প্রার্থী তসলিমা বেগম, ঢাকা-১৮ ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সাবিনা জাভেদ, নেত্রকোনা-৪ বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির চম্পা রানী সরকার, বগুড়া-৬ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের দিলরুবা, টাঙ্গাইল-৫ গণসংহতি আন্দোলনের ফাতেমা রহমান বিথী, চট্টগ্রাম-২ স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আক্তার, চাঁদপুর-২ এবি পার্টির রাশিদা আক্তার, নওগাঁ-৪ স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. আরফানা বেগম, জামালপুর-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হোছনে আরা বেগম।

 

এবার সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ঘোষিত ন্যূনতম প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি বলে অভিযোগ করেছে নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম। সংগঠনটির দাবি, রাজনৈতিক দলগুলো ঘোষিত ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন বাস্তবায়ন করেনি, যা নারী নেতৃত্বের প্রতি দলগুলোর অনীহা ও দায়সারা অবস্থার প্রতিফলন।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর কম অংশগ্রহণ ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নারীর ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব যেন নিশ্চিত হয় এ জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। নারীরা আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি। এ জন্য নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্ব অন্তত অর্ধেক নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে রাজি হলেও তা শেষ পর্যন্ত তারা রক্ষা করেনি। এতে আবারও পুরুষতন্ত্রের জয় হলো এবং নারীর অধিকার পরাজিত হলো।

 

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর দাখিলকৃত মনোনয়নপত্রের বিষয়ে কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। খালেদা জিয়া ছাড়া বিএনপি থেকে এবার ১০ জন নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ প্রার্থীরা হলেন- ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম, ঝালকাঠি-২ ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, মাদারীপুর-১ নাদিরা আক্তার, মানিকগঞ্জ-৩ আফরোজা খানম, নাটোর-১ ফারজানা শারমিন, সিলেট-২ মোছা. তাহমিনা রুশদীর, শেরপুর-১ সানসিলা জেবরিন, যশোর-২ মোছা. সাবিরা সুলতানা, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ।

 

এনসিপি থেকে তিন নারী প্রার্থী হলেন- ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারুল, ঢাকা-২০ নাবিলা তাসনিদ এবং ঝালকাঠি-১ থেকে মাহমুদা আলম মিতু।

 

জাতীয় পার্টি থেকে খুলনা-৫ শামীম আরা পারভিন, ঝিনাইদহ-১ মনিকা আলম, ঠাকুরগাঁও-২ থেকে নুরুননাহার বেগম, খাগড়াছড়ি থেকে মিথিলা রোয়াজা, নরসিংদী-৫ মেহেরুননেছা খান হেনা এবং ঢাকা-১০ আসনে বহ্নি বেপারি। এ ছাড়া স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ব্রাক্ষণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা, ঢাকা-৯ আসনে তাসনিম জারাসহ মোট ৪১ প্রার্থী।

 

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, গণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), গণসংহতি আন্দোলন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি, বাংলাদেশের লেবার পার্টি, আমজনতার দল, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি থেকে নারীরা জাতীয় নির্বাচনে নিজ নিজ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

 

এ প্রার্থীদের মধ্যে ২৭ জন প্রার্থীর সম্পদ বিবরণী থেকে দেখা যায়, তাদের কোটি টাকার ওপর সম্পদ রয়েছে। কিছু প্রার্থী আবার কয়েক কোটি টাকার মালিক। এর মধ্যে ১৭ জন নারী প্রার্থী যারা স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন তাঁরা কোটিপতি।

 

নারী প্রার্থী দেয়নি জামায়াতসহ ২৯ দল : এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করলেও নারী প্রার্থী দেয়নি অনেক রাজনৈতিক দল। মাত্র ২২টি দল নারী প্রার্থী দিয়েছে। ২৯টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বড় দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কোনো নারী প্রার্থী ছাড়াই ১৭৬টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। যদিও দলটির নেতারা দাবি করেন, দলের নেতৃত্বের কমপক্ষে ৪০ শতাংশ নারী। এরপর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি মনোনয়ন জমা দিলেও সেখানে কোনো নারী প্রার্থী নেই। একইভাবে খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টসহ অন্য দলগুলো শুধু পুরুষের প্রার্থী করেছে। নারী প্রার্থী দেয়নি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, জনতার দল, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটও।