শনিবার   ১০ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ২৬ ১৪৩২   ২১ রজব ১৪৪৭

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে নিপাহ ভাইরাস

সাপ্তাহিক আজকাল

প্রকাশিত : ০৮:১৫ এএম, ৮ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার

সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। প্রতি বছর নতুন নতুন জেলায় ভাইরাসটি শনাক্ত হচ্ছে। ফলে গত ২৫ বছরে দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায়। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হওয়া ৩৪৭ জনের মধ্যে ২৪৯ জনই মারা গেছেন। এদিকে, ২০২৪ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত বছর (২০২৫) দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বজুড়ে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার ৭২ শতাংশ হলেও দুই বছর ধরে দেশে মৃত্যুহার শতভাগ। ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তন হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গতকাল বুধবার দুপুরে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) মিলনায়তনে ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় এসব তথ্য জানানো হয়।

 

এতে আইইডিসিআরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসকে নিপাহর মৌসুম ধরা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও নিপাহ রোগী পাওয়া গেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, খেজুরের কাঁচা রস ছাড়াও সংক্রমণের অন্য কোনো উৎস থাকতে পারে। এ ছাড়া গত বছর প্রথমবারের মতো ভোলায় রোগী শনাক্ত হয়েছে, যেখানে আগে কখনো এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল না। গ্লোবালি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। তবে গত বছর (২০২৫) রেকর্ড করা চারটি কেসের সবকটিতেই শতভাগ মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী—এই চার জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টিতেই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। গত বছর নিপাহ ভাইরাসে মৃত চারজনের মধ্যে নওগাঁর ৮ বছরের এক শিশুর ঘটনাটি ছিল দেশে প্রথম ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’, যা শীতকাল ছাড়াই আগস্ট মাসে শনাক্ত হয়। ওই শিশুর সংক্রমণের উৎস ছিল বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল (কালোজাম, খেজুর, আম) খাওয়া, যা নিপাহ ছড়ানোর একটি নতুন ও অ্যালার্মিং হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

 

তিনি বলেন, খেজুরের রস খাওয়ার পর ভাইরাস প্রকাশের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ২ থেকে ২৮ দিন। আর মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে এই সময় ৯ থেকে ১১ দিন। কেউ খেজুরের রস খাওয়ার পর লক্ষণ দেখা দিলে তাকে অন্তত ২৮ দিন আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে অন্যের শরীরে ভাইরাস না ছড়ায়। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নিপাহ আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সরাসরি অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমণ ছড়ায়, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য উচ্চঝুঁকি তৈরি করে। নিপাহ ভাইরাসের জন্য এখনো কার্যকর কোনো চিকিৎসা বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ৩৪৭ জন মানুষের শরীরে নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তার মধ্যে মারা গেছেন ২৪৯ জন। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার শতভাগ। নিপাহ এখন শুধু শীত বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি সারা বছরের এবং বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। সতর্কতা হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা পিঠা উৎসবকে প্রমোট করব, রস উৎসবকে নয়।’ অনলাইনেও খেজুরের রস কেনা যাবে না। আধা খাওয়া ফল খাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। খেজুরের রস খাওয়ার পর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইইডিসিআর) সংক্রামক রোগ বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী ও নিপাহ ভাইরাস জরিপ সমন্বয়কারী ডা. সৈয়দ মঈনুদ্দিন সাত্তার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।