রোববার   ১৫ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ৩০ ১৪৩২   ২৬ রমজান ১৪৪৭

ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের মূলে কে?

নিউজ ডেস্ক

আমাদের নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:১৭ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮ শুক্রবার

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর গত মঙ্গলবার প্রথম বার্ষিক বাজেট ঘোষণা করল ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিষ্ঠুর’ পদক্ষেপের সঙ্গে সমন্বয় করেই বর্তমান বাজেট পেশ করা হয়েছে।

চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেন। একই সঙ্গে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। এর ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং বেশির ভাগ বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। আগামী বছর দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে অনুমান করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।

তবে ইরানের সব অর্থনৈতিক সমস্যার মূলেই যে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, বিষয়টি এমন নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের অনেক সংকটের উত্পত্তি ট্রাম্প কিংবা ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার আগেই সৃষ্টি হয়েছে।

হাসান রুহানির পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আমলে ইরানের ব্যাংকগুলো পরিশোধের কথা বিবেচনা না করেই বিশাল অংকের ঋণ বিতরণ করেছে। যে চাপ এখনো তাদের বহন করতে হচ্ছে। ভয়াবহ অর্থ সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো মানুষকে আমানতে আগ্রহী করার জন্য ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ চালু করেছে। আমানতের ওপর উচ্চহারের সুদের ফলে ইরানের ব্যাংকগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে।

তাছাড়া অবিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির কারণে ব্যাংকগুলো চাপের মুখে পড়েছে। দেশটির নির্মাণ শিল্পের পরিস্থিতি যখন খুবই ভালো ছিল, তখন ব্যাংকগুলো এ খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করে। কিন্তু ২০১৩ সালে এ খাতটি ঝিমিয়ে পড়ার পর ব্যাংকগুলো বিপদের মুখে পড়ে যায়। তাদের বেশির ভাগ সম্পত্তি থেকে যায় অবিক্রয়যোগ্য।

তেহরানের আলজাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির লেকচারার নার্গিস দারবিশ জানান, বর্তমানে ইরানে ২০ লাখের মতো বাড়ি খালি পড়ে আছে। চাহিদা নেই বলেই বাড়িগুলো বিক্রি হচ্ছে না।

তবে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হোক— ইরান সরকার তা চান না। কেননা এর ফলে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি প্রত্যাহারের ফলে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান পড়ে গেছে। তবে শুধু এই একটি কারণেই রিয়াল দুর্বল হয়ে পড়েনি। এর পেছনে আরো অনেক কারণ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেমাতি জানান, ‘অর্থ সরবরাহের ভয়ঙ্কর প্রবৃদ্ধির’ ফলে রিয়াল দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ইরানের অর্থনীতিতে নগদপ্রবাহের পরিমাণ বছরে ২৪ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেয়েছে। নগদপ্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটি খুব কমই লাভজনক বা নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছে। এর ফলে রিয়ালের মান আরো নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। দেশটির নাগরিকরা রিয়ালের পরিবর্তে ডলার সঞ্চয় করা শুরু করেছে।

দেশটির অর্থনীতিবিদ মুসা ঘানিনেজাদ জানান, চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তে রিয়ালের মান পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়ার পর ইরান সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই বিভ্রান্তিমূলক। তারা দাবি করেছে, তারা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে, অথচ তাদের কোনো সুসঙ্গত কৌশল নেই।

একপর্যায়ে ডলারপ্রতি রিয়ালের মান ৪২ হাজার রিয়ালে পৌঁছার পর রিয়ালের মানকে স্থিতিশীল করতে সরকার জোর করে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় কালোবাজারি। কিছুদিন পর সরকার ভুল স্বীকার করে এক্সচেঞ্জ হাইজগুলো আবার খুলে দেয় এবং একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বরখাস্ত করে। এ সময় প্রচণ্ড ধরপাকড় চালানো হয়, বেশকিছু ব্যবসায়ী ও ট্রেডারকে শাস্তি দেয়া হয়।

কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। দেশটিতে আমদানি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে।

ইরান সরকার দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এখনো দেশটির বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে আর কিছু সেনাবাহিনী বা সরকারসংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলের হাতে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ এহসান সুলতানি জানান, স্টিল ও পেট্রোকেমিক্যালের মতো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত খাতগুলো সরকারের কাছ থেকে বিশাল অংকের ভর্তুকি পাচ্ছে, অথচ তারা সেই অর্থে মুনাফা কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।