চাইনিজ নববর্ষের অদ্ভুত রীতি-নীতি
নিউজ ডেস্ক
আমাদের নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৭:২৩ পিএম, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮ শুক্রবার
চীনে চন্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুসারে নতুন বছরের প্রথম দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে উদযাপন করা হয়। চাইনিজ নববর্ষের এই উৎসব ইংরেজী নতুন বছরের মত একদিন নয় বরং পালন করা হয় টানা দুই সপ্তাহ। স্থানীয়ভাবে এই উৎসবকে বলা হয়‘চুন জি’। চাইনিজ নববর্ষ শুরুর নিদিষ্ট কোন তারিখ নেই। তাই প্রতিবছর নববর্ষের তারিখ পরিবর্তিত হয়। যেমন বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২০১৯ সালে চাইনিজ নববর্ষ শুরু হবে ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ থেকে।
চাইনিজদের নববর্ষ ও বসন্ত দুইয়েরই আগমন ঘটে একই সময়। বিশ্বের সবচেয়ে প্রখ্যাত ও জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি হচ্ছে চাইনিজ নববর্ষ। চাইনিজ নববর্ষের সঙ্গে বেশ কিছু উপকথা ও রীতি-নীতি জড়িত। চীনে এই উৎসবকে দেবতা ও পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।
উৎসবের প্রস্তুতি হিসেবে ঐহিত্যগতভাবে চীনের প্রতিটি পরিবার তাদের ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে যাতে করে নতুন বছর সব ধরনের দুর্ভাগ্যকে তাড়িয়ে দিয়ে সৌভাগ্য বয়ে আনতে সক্ষম হয়।
উৎসবে চাইনিজদের আরও একটি ঐতিহ্য হচ্ছে, ঘর-বাড়ির দরজা-জানালা লাল রঙের কাগজ দিয়ে সাজানো। লাল রঙকে চাইনিজরা সৌভাগ্য ও সুখের রঙ বলে মনে করে। উৎসবে পালিত অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে আছে আতশবাজি পোড়ানো এবং লাল কাগজের খামে মুড়ে অর্থ প্রদান। নতুন চন্দ্রবর্ষে গতানুগতিক ঐতিহ্যের বাইরে মজার এবং অদ্ভুত অনেক রীতিও পালন করতে দেখা যায় চাইনিজদের। আজ জানবো সেসবের কয়েকটি সম্পর্কে।
চাইনিজ নতুন বছর নয়
চীনে চন্দ্র দিনপঞ্জি অনুসারে নতুন বছর নির্ধারিত হয়। আর এ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত উৎসব স্থানীয়দের কাছে বসন্ত উৎসব বা নতুন চন্দ্র বছর নামের পরিচিত। এই উৎসব শুধুমাত্র চাইনিজরাই পালন করে তা নয়। জানুয়ারির শেষ থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের আরো অনেক দেশে চন্দ্র নতুন বর্ষ উদযাপন করা হয়। চীনের এ উৎসব প্রতিবেশী দেশেগুলোতেও প্রভাব ফেলে। যাদের অন্যতম কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইপে।
যদিও এই উৎসব পালিত হয় বিশ্বব্যাপী। মূলত বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চীনারা এই উৎসব পালন করেন। চীন ছাড়া যেসব দেশে চাইনিজ নতুন বর্ষ পালন করা হয় তাদের অন্যতম হচ্ছে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, মাউরিটুয়াসসহ উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশ।
যানজটে নাকাল সবাই
আমাদের দেশে ঈদকে সামনে রেখে সবাইকে যেমন পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির জন্য শহর ছেড়ে নিজ গ্রামের বাড়িতে ছুটতে দেখা যায়। তেমনি চীনেও নতুন চন্দ্র বর্ষকে পুরো দেশের সবাই পারিবারিক পুনর্মিলনির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব সড়ক-মহাসড়কে পড়ে অবধারিতভাবেই। চন্দ্রবর্ষকে সামনে রেখে আত্মীয়-পরিজনদের সাথে মিলিত হবার চেষ্টার ফলে প্রতি বছর বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানব স্থানান্তর বা হিউমেন মাইগ্রেশানের ঘটনা ঘটে চীনে। প্রিয়জনের মুখ দেখার জন্য ওইসময় চাইনিজরা সব রকমের কষ্ট স্বীকার করে নেয়।
যাত্রীতে বোঝাই বাসে ঠেলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা, কালোবাজার থেকে টিকেট ক্রয়, ভীড়ে ঠাসা ট্রেনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করা যাদের অন্যতম। ২০১৪ সালের এক হিসেবে দেখা গেছে ওই বছর ৩.৬২ বিলিয়ন মানুষ নববষ উপলক্ষ্যে কর্মস্থল বা শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভ্রমণ করেছেন। একই অবস্থা চন্দ্রবর্ষ পালন করা বিশ্বের অন্য দেশুগুলোতেও। যেমন ২০১৫ সালে কোরিয়াতে চন্দ্রবর্ষ উপলক্ষ্যে ৩০ মিলিয়ন মানুষ নিজস্ব গাড়ি, বাস, ট্রেন অথবা বিমান যোগে নিজ আবাস অঞ্চলে ফেরত আসেন।
একদিনের উৎসব নয়
টানা ১৫ দিন ধরে চন্দ্রবর্ষ উপলক্ষ্যে উৎসব পালিত হয়। ছুটির ওই দিনগুলোতে উৎসবে চাইনিজরা যোগ দেয় নানারকম কর্মকান্ডে। যেমন তারা কেউ ঘোড় দৌড়ে বাজি ধরেন, কেউ কুচকাওয়াচ দেখেন, কেউবা বাজারে পছন্দের পণ্য কিনতে দর কষাকষি করেন অথবা টেম্পলের ভেতরে সবচেয়ে আর্কষণীয় জায়গা দখলের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হন।
কুসংস্কারের মৌসুম
কলেজের পড়ার সময় অনেককে দেখা যায় নিজের যত্ন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এমনকি গোসলের দিকে নজর কম দিতে কখনো বা একদমই না দিতে। চাইনিজ নতুন বছরের প্রথম দিন সবাই ওইসব কলেজ ছাত্রদের অনুরুপ জীবনে ফিরে যায়। মানে ওই দিন তারা গোসল করা, জামা-কাপড় ধোয়া বা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া থেকে বিরত থাকে। এমনকি ওইদিন কোন ধরনের ময়লা আবর্জনাও ফেলেন না। চাইনিজরা বিশ্বাস করেন এসবের অন্যথা করলে তাদের ভাগ্য ও সমৃদ্ধিও ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। এরপর দ্বিতীয় দিন, চাইনিজরা তাদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। মূলত এই দিন থেকে বছরের সূচনা বলে মনে করা হয়। তৃতীয় দিন, তারা তাদের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজনের বাসায় বেড়াতে যান। আর সপ্তম দিন, তারা একযোগে নিজেদের জন্মদিন পালন করেন।
ভাড়া নেয়া যায় বয়ফেন্ডও
চীনা নববর্ষ সবার জন্য সবসময় সুখের নাও হতে পারে। অসুখীদের ওই তালিকার শীর্ষে আছেন যারা নববর্ষ পর্যন্ত নিজের জীবন-সঙ্গী খুজে পায়নি তারা বিশেষ করে নারীরা। নববর্ষে পারিবারিক পুনর্মিলনের সময় অবধারিতভাবে কেন এখনও আইবুড়ি হয়ে আছো কেন? কেন বিয়ে করনি? ইত্যাদি অপ্রীতিকর প্র্শ্নবানের শিকার হতে হয় সিঙ্গেলদের। অর্থাৎ ‘বিয়ে’ পারিবারিক আলোচনার এজেন্ডাতে থাকবেই। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি ঠেকাতে অভিনব সমাধান নিয়ে এসেছে উদ্ধাবনী শক্তিতে বলীয়ান চাইনিজরা। সমাধানটি হচ্ছে, ভাড়ায় বয়ফ্রেন্ড পাবার সুবিধা।
চীনের সবচেয়ে বড় খুচরা বিক্রির প্লাটফর্ম তাওবাও এ বয়ফ্রেন্ড ভাড়া নেয়ার একটি আলাদা সেকশান আছে। তাই বলা যায়, চাইনিজ পিতা-মাতা ও আত্নীয়-স্বজনরা জীবন-সঙ্গী কই? জীবন-সঙ্গী কই? বলে আর সিঙ্গেলদের বিরক্ত করতে পারবেন না। এবার জানা যাক খরচের দিকটা। ভুয়া বিয়ের জন্য প্রতিদিন খরচ করতে হবে ৮২ ডলার থেকে ১হাজার ৩শ ২১ ডলার পর্যন্ত। ওই প্যাকেজের আওতায় বিনামুল্যের কিছু সেবাও মিলছে। যেমন হাত ধরা, আলিঙ্গন করা বা বিদায়ী চুমো দেয়া ইত্যাদি। এর বাইরে অতিরিক্ত সেবা নিতে চাইলে পরিশোধ করতে হবে বাড়তি টাকা। চাইনিজ গণমাধ্যম পিপলস ডেইলির মতে, ডিনারে গেলে প্রতি ঘন্টার জন্য খরচ পড়বে ৮ ডলার, সিনেমা দেখতে প্রতি ঘন্টায় ৫ ডলার-তবে থ্রিলার মুভির ক্ষেত্রে এ খরচ দ্বিগুন হয়ে যাবে।
ভাষাগত কুসংস্কার
চাইনিজ নববর্ষে দেশটিতে এলাকাভেদে কিছু কাজ করা যায় আর কিছু কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চারণ। পুরো চন্দ্র মাসে জুতো বিক্রি বন্ধ থাকে। চীনা ভাষায় জুতোকে বলা হয় ‘হাই’। ক্যানটোনিজ ভাষায় হাই এর উচ্চারণ ‘হারানো’ও ‘দীর্ঘশ্বাস’শব্দদুটোর মতো।
উচ্চারণগত এ ধরনের মিলের কারণে এ সময় জুতো বেচা-কেনা বন্ধ থাকে। অন্যদিকে, ভাগ্য নির্দেশক চাইনিজ শব্দ (ফু) যার উচ্চারণ ‘দাও’শব্দটির এর মতো যার অর্থ আগমন। তাই চাইনিজরা নতুন বছরে সৌভাগ্য বয়ে আনার জন্য দরজায় ‘ফু’ শব্দটি টানিয়ে রাখে।
