মঙ্গলবার   ১০ মার্চ ২০২৬   ফাল্গুন ২৬ ১৪৩২   ২১ রমজান ১৪৪৭

এভারেস্টের প্রথম হিরোর রোমাঞ্চকর গল্প

আমাদের নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:২৫ এএম, ২৩ মার্চ ২০১৯ শনিবার

আমরা সকলেই জানি পৃথিবীর সবথেকে বড় পর্বত শৃঙ্গ হল মাউন্ট এভারেস্ট। যার আয়তন ৮৮৪৮ মিটার এবং যে চূড়ায় পৌঁছানো প্রচন্ড কঠিন একটি কাজ। কিন্তু বর্তমানে যে কঠিন কাজ অনেক পর্বতারোহীরা সম্পন্ন করেছে এবং আরো করবে। আপনি কি জানেন মাউন্ট এভারেস্টে যাত্রাকালে গড়ে প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজনের মৃত্যু ঘটে। তবে যদি এই অবস্থা আজকের দিনে ঘটে থাকে তবে প্রথম মাউন্ট এভারেস্ট আরোহীদের কি অবস্থা হয়েছিল খালি একবার ভেবে দেখুন। এভারেস্টের প্রথম হিরোর রোমাঞ্চকর গল্পকে কেন্দ্র করে আজকের এই আলোচনা। 

পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বড় পর্বতমালা মাউন্ট এভারেস্টে উঠার স্বপ্ন ১৯২১ সালের আগে থেকেই শুরু হয়। কিন্তু সেই পর্বতমালার শৃঙ্গে কেউই  উঠতে পারছিল না। কেননা এভারেস্টে উঠাটা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। যেখানে পৌঁছানোর জন্য খুবই জটিল এবং ভয়ংকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ ঊনত্রিশ হাজার ত্রিশ ফিট উঁচু পর্বতের রাস্তায় অনেক মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে আর এই মিশনে আজ অব্দি অনেক লোক পরাজিত হয়েছে আবার অনেক লোক মারাও গেছেন। এমনকি এই পর্বতমালাতে এখনও অনেক মানুষের মৃতদেহ বরফের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে যা আজও পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এসব ঘটনার পরেও কিছু সাহসী মানুষ হার মানেনি। তারা অনবরত এভারেস্টে ওঠার প্রয়াস চালিয়ে গেছে আর এসব সাহসী বীরদের মধ্যে একজন ছিল নেপালের শেরপা তেন সিং। 

১৯৫২ সালে নেপালের বাসিন্দা শেরপা তেন সিংয়ের মাথায় মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার ইচ্ছা মাথাচাড়া দেয়। তাই সে আরেকজন পর্বতারোহী সুইজারল্যান্ড এর র‍্যামেন লান্ড বার্ডকে সঙ্গে নিয়ে মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার ঝুঁকি নেয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে শেরপা ব্যর্থ হয়। ১৯৫১ সালে র‍্যামন ও তেন্সিং মোটামুটি এভারেস্ট শৃঙ্গে কাছে চলে এসেছিল। কিন্তু অত্যন্ত বাজে আবহাওয়ার কারণে এভারেস্ট পর্বত শৃঙ্গ থেকে এক হাজার ফুট দূরত্ব থেকে ফিরতে হয়েছিল তাদের। মাউন্ট এভারেস্টের এতটা কাছাকাছি এসেও ফিরে চলে যাওয়ার দুঃখটা তাদের সঙ্গেই বয়ে চলে ছিল, তাতে র‍্যামন দেবে গেলেও শেরপা তেনসিং হার মানেননি। তেন সিং আবার ১৯৫৩ সালে ৭ জন ইংরেজ এবং দুইজন সুইজারল্যান্ডের পর্বতারোহীকে নিয়ে মাউন্ট এভারেস্টের যাত্রায় বেড়িয়ে পড়েন। 

তেনসিং, আডমান হেনরি এবং তাদের টিম পর্বতারোহণ শুরু করেন ৯ এপ্রিল ১৯৫৩ সালে। বরফের রাস্তা, মাইনাস টেম্পারেচার, হিম নদী, নদী থেকে ভেঙে পড়া বরফের পাহাড় এবং বরফের খাত ইত্যাদি বাধা এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তারা একটির পর একটি ক্যাম্প তৈরি করে চলেছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। মোটামুটি বিশ হাজার ফুট উপরে ওঠার পর একটি ছোট্ট পাহাড়ের খাদকে পার করার জন্য হেনরি লাফ দেয় কিন্তু তার ভরের কারণে বরফের রাস্তা সেখান থেকে খসে পরে আর সেই মুহূর্তে হেনরি প্রায় বরফের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাতে বসে। তখনই সময় থাকতেই হেনরির পেছন থেক্রিরতেন সিং তাকে দড়ি ছুড়ে দেয় আর সেই দড়ি ধরে হেনরি কোনো রকম প্রাণে বেঁচে যান। 

আর এরপরই তেন সিং ও হেনরির টিম আস্তে আস্তে এভারেস্ট পর্বত শৃঙ্গের কাছে চলে আসতে থাকেন। কিন্তু তেন সিং এর আগে পর্বত আরহন শুরু করে চার্লস ওয়ারনের ১০জন দল। যারা তেন সিংয়ের দলের অনেক আগে এভারেষ্ট চূড়ার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ কোনো কারণে ওয়ারনের টিম এভারেস্টে উঠতে ব্যর্থ হলে বা পর্বতারোহণ বন্ধ করে যদি ফিরে আসে তবে তারপরই তেন সিংয়ের দল এগিয়ে যেতে পারবে। তেন সিং ও হেনরির দল মোটামুটি অর্ধেকের বেশি পর্বতারোহণ করে ফেলেছিল কিন্তু এভারেস্টের একেবারে কাছাকাছি আসার শেষ খাঁদটি অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ছিল আর যেখানে পৌঁছাতে গিয়ে অনেক অনেক পর্বতারোহীরা নিজেদের জীবন ত্যাগ করেছেন। 

ঠিক সেখানে ১৯৫৩ সালের ২৬ মে মাউন্ট এভারেস্টের শিখরে কাছ থেকে ওয়ারনের টিম ৩০০ ফুট দূরে ছিল কিন্তু ওয়ারন এবং তার সাথীরা খুবই ক্লান্ত ছিল। তাদের শরীরে আর চলার মত শক্তিও ছিল না এবং তাদের এক পা চলার মতো ক্ষমতাও ছিল না। তাই তারা শৃঙ্গ থেকে প্রায় ৩০০  ফুট দূর থেকে ফিরে যায়। হয়তো বা ইতিহাসে অন্য কোনো ব্যক্তির নামে লেখার জন্য আগ্রহী ছিল। ঐ দলটি চলে আসার পরে তেন সিং এবং হেনরির টিম অটোমেটিকেলি আগে চলে আসে এবং তারা একটি রাত ঘুমানোর পরে পরের দিন সকালেই তেন সিং ও তার দল নিজেদের যাত্রার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায়। 

তখন তাপমাত্রা মাইনাস ২৭ ডিগ্রি ছিল। পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ছিল তবুও এই সাহসী বীরেরা হাল ছাড়েনি। তারা প্রতিকূলতা ও নিজেদের শরীরের কঠিনতার সম্মুখীন করতে করতে একের পর এক বাধা অতিক্রম করতে থাকে। এভাবে সকাল নয়টার সময় তারা দক্ষিণ শিখরে পৌঁছে যায় কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের অক্সিজেন কমতে থাকে আর তাদের কাছে তখন আর পর্যাপ্ত অক্সিজেন ছিল না যেটা দিয়ে তারা পর্বতের পুরো অভিযান করতে পারবে বা নিচে ফিরে যেতে পারবে। যেন তারা নিজেদের মৃত্যুকে সামনেই দেখছিল। এমনই পরিস্থিতিতে তেন সিংয়ের গতি কমতে থাকে আর তার পা ধীরে ধীরে ভারি হতে শুরু করে। ঠিক একই রকম অবস্থা কিছুটা হেনরিরও হচ্ছিল। 

হেনরি তেন সিংয়ের দিকে তাকায় এবং সে তেন সিংকে কিছুটা সময় থামিয়ে দেয় বিশ্রামের জন্য। সেই সময়ের মধ্যে হেনরি তেন সিং এর অক্সিজেনের নলকে পরিস্কার করে কারণ তেন সিং এর শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এভাবে আস্তে আস্তে মাথা ঠান্ডা রেখে তারা সমস্ত কঠিন পরিস্থিতিতে অতিক্রম করতে থাকে এবং তাদের পদক্ষেপ এভারেস্ট পর্বত মালার দিকে বাড়িয়ে দিতে থাকে। এভাবে শেষ পর্যন্ত ২৯ মে ১৯৫৩ সালের শেরপা তেন সিং ও হেনরির নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়। যখন তারা সকাল ১১ টার সময় পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে উঁচু পর্বত শৃঙ্গ ২৯ হাজার ৩০ ফুট অর্থাৎ ৮৮৪৮  মিটার উঁচুতে পৌঁছায়। সেই সময়টা তাদের আনন্দের আর কোন সীমায ছিল না। তাদের মাথায় অতীতের কোনো কষ্ট সামনে পরিশ্রমের কোন চিন্তায় ছিল না। 

আসলে সেসময় তারা দুজন যেন অন্য পৃথিবীতেই দাঁড়িয়ে ছিল। কারণ পৃথিবীর সবথেকে উঁচুতে থাকা স্থান থেকে পৃথিবীর নিচের দৃশ্য কিছু ক্ষণের জন্য যেন তাদের মত মুগ্ধ করেছিল, আর যে দৃশ্য তারাই প্রথম দেখেছিল। কিন্তু একটা সময় তাদের অক্সিজেনের অভাব এবং শরীরের খাটনি তাদের জ্ঞান ফেরার। তারা খুব সামলে চূড়া থেকে জীবিত ফিরে আসে এবং জয় করে পৃথিবীর এমন চারটি চোখ যে চোখ চারটি প্রথম এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সৌন্দর্যকে নিরক্ষন করেছিল। তাদের এই যাত্রায় না ছিল এভারেস্টের গায়ে দড়ি লাগানো না ছিল পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, তাও তারা পেরেছিল এবং গড়েছিল এমন এক রাস্তা যা দশকের পর দশক ধরে অবলম্বন করেছে পর্বতারোহীরা।